Sunday, 21 December 2014

সোনার তরী

- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।
কুলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।
রাশি রাশি ভারা ভারা
ধান কাটা হল সারা,
ভরা নদী ক্ষুরধারা
খরপরশা
কাটিতে কাটতে ধান এল বরষা।
একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা
চারিদিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।
পরপারে দেখি আঁকা
তরুছায়া-মসিমাখা
গ্রামখানি মেঘে ঢাকা
প্রভাত বেলা
এ পারেতে ছোটো খেত, আমি একেলা।
গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে,
দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।
ভরা পালে চলে যায়,
কোনো দিকে নাহি চায়,
ঢেউগুলিনিরুপায়
ভাঙে দু ধারে –
দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।
ওগো, তুমি কোথা যাও কোন্ বিদেশে,
বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে।
যেয়ো যেথা যেতে চাও,
যারে খুশি তারে দাও,
শুধু তুমি নিয়ে যাও
ক্ষণিক হেসে
আমার সোনার ধান কুলেতে এসে।
যত চাও তত লও তরণী, পরে।
আর আছে? আর নাই, দিয়েছি ভরে।
এত কাল নদীকূলে
যাহা লয়ে ছিনু ভুলে
সকলই দিলাম তুলে
থরে বিথরে –
এখন আমারে লহো করুণা করে।
ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই-ছোটো সে তরী
আমারই সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।
শ্রাবণ গগন ঘিরে
ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,
শুন্য নদীর তীরে
রহিনু পড়ি-
যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।



Monday, 15 December 2014

বৈশাখের রুদ্র জামা

- মুস্তফা আনোয়ার

বৈশাখের রুদ্র জামা আমাকে পরিয়ে দে মা
আমি তোর উজাড় ভাঁড়ারে বারুদের গন্ধ বুক ভরে নেব।
এখন তোর ভীষণ রোগ, গায়ে চুলো গন্ গন্ করছে,
আমাকে পুড়িয়ে দিলি মা।
নাৎসী হাওয়া তোর
পিদিমে ফুঁ দিতেই, চপ চপ করে ভিজে গেল মুখ
এতো রক্ত কেনরে মা, এত রক্ত কোন দিন আমি দেখিনি- দেখিনি মা।
আমি জানি আমার শার্টের রক্তের দগদগে চিহ্ন
তোর পতাকার বুকের ভিতর দাউ দাউ জ্বলছে
আমি রক্তের প্রতিশোধ নেব মারে
রক্তের বদলে আমি রক্ত শুষে খাব।
যেন আমি এক রক্তপায়ী রাগী ঈশ্বরের
গরগরে কন্ঠস্বর হয়ে গেছি।
ঘর নেই, বোন নেই, ভাই নেই, নেই নেই,
মারে আমার কিছুই নেই-শুধু রাইফেল
দাঁতে দাঁত চেপে খুঁজে ফেরে শত্রুর খুনি ছাউনি,
লোভাতুর হাত শুধু চায় শত্রুকে হত্যার
হত্যার, হত্যার এই বিনিদ্র রক্তাক্ত উল্লাস।
এবার নববর্ষের দেয়া তোর বৈশাখী জামায়, ওদের রক্তে ভিজিয়ে তোর পায়ে এনে দেবো মারে।
বৈশাখের রুদ্র জামা আমাকে পরিয়ে দে মা।

Friday, 12 December 2014

যা চেয়েছি, যা পাবো না

- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়


- কী চাও আমার কাছে ? 
- কিছু তো চাইনি আমি ! 
- চাওনি তা ঠিক । 
তবু কেন এমন ঝড়ের মতো ডাক দাও ?
 
- জানি না । ওদিকে দ্যাখো ... 
রোদ্দুরে রুপোর মতো জল 
তোমার চোখের মতো দূরবর্তী নৌকো 
চর্তুদিকে তোমাকেই দেখা। 
- সত্যি করে বলো, কবি, কী চাও আমার কাছে ? 
- মনে হয় তুমি দেবী 
- আমি দেবী নই । 
- তুমি তো জানো না তুমি কে ! 
- কে আমি ! 
- তুমি সরস্বতী 
শব্দটির মূল অর্থে যদিও মানবী 
তাই কাছাকাছি পাওয়া 
মাঝে মাঝে নারী নামে ডাকি 
- হাসি পায় শুনে 
যখন যা মনে আসে তাই বলো, ঠিক নয় ?
 
- অনেকটা ঠিক । যখন যা মনে আসে... 
কেন মনে আসে ? 
- কী চাও, বলো তো সত্যি ? কথা ঘুরিয়ো না 
- আশীর্বাদ ! 
- আশীর্বাদ ! আমার, না সত্যি যিনি দেবী 
- তুমিই তো সেই ! 
টেবিলের ঐ পাশে ফিকে লাল শাড়ি 
আঙ্গুলে ছোঁয়ানো থুতনি, 
উঠে এসো 
আশীর্বাদ দাও, মাথার ওপরে রাখো হাত 
আশীর্বাদে আশীর্বাদে আমাকে পাগল করে তোলো 
খিমচে ধরো চুল, আমার কপাল নখ দিয়ে চিরে দাও 
- যথেষ্ট পাগল আছো ! আরও হতে চাও বুঝি ? 
- তোমাকে দেখলেই শুধু এরকম, 
নয়তো কেমন শান্তশিষ্ট 
- না দেখাই ভালো তবে ! তাই নয় ? 
- ভালো মন্দ জেনে শুনে যদি এ-জীবন কাটাতুম 
তবে সে-জীবন ছিল শালিকের, দোয়েলের 
বনবিড়ালের কিংবা মহাত্মা গান্ধীর 
ইরি ধানে, ধানের পোকার যে-জীবন 
- যে জীবন মানুষের ? 
- আমি কি মানুষ নাকি ? ছিলাম মানুষ বটে 
তোমাকে দেখার আগে 
- তুমি সোজাসুজি তাকাও চোখের দিকে 
অনেকক্ষণ চেয়ে থাকো 
পলক পড়ে না 
কী দেখো অমন করে ?
 
- তোমার ভিতরে তুমি, 
শাড়ি-সজ্জা খুলে ফেললে তুমি 
তারা আড়ালে যে তুমি 
- সে কি সত্যি আমি ? না তোমার নিজের কল্পনা ? 
- শোন্ খুকী 
- এই মাত্র দেবী বললে... 
- একই কথা ! কল্পনা আধার যিনি, তিনি দেবী- 
তুই সেই নীরা 
তোর কাছে আশীর্বাদ চাই 
- সে আর এমন কি শক্ত ? এক্ষুনি তা দিতে পারি 
- তোমার অনেক আছে, কণা মাত্র দাও 
- কী আছে আমার ? জানি না তো 
- তুমি আছো, তুমি আছো, এর চেয়ে বড় সত্য নেই 
- সিঁড়ির ওপরে সেই দেখা 
তখন তো বলোনি কিছু ? 
আমার নিঃসঙ্গ দিন, আমার অবেলা 
আমারই নিজস্ব, শৈশবের হাওয়া শুধু জানে
 
- দেবে কি দুঃখের অংশভাগ ? 
আমি ধনী হবো 
- আমার তো দুঃখ নেই ! 
দুঃখের চেয়েও কোনো সুমহান আবিষ্টতা 
আমাকে রয়েছে ঘিরে 
তার কোনো ভাগ হয় না 
আমার কী আছে আর, কী দেবো তোমাকে ?
 
- তুমি আছো, তুমি আছো, এর চেয়ে বড় সত্য নেই ! 
তুমি দেবী, ইচ্ছে হয় হাঁটু গেড়ে বসি 
মাথায় তোমার করতল, আশীর্বাদ... 
তবু সেখানেও শেষ নেই 
কবি নয়, মুহূর্তে পুরুষ হয়ে উঠি 
অস্থির দু'হাত 
দশ আঙুলে আঁকড়ে ধরতে চায় 
সিংহিনীর মতো ঐ যে তোমার কোমর 
অবোধ শিশুর মতো মুখ ঘষে তোমার শরীরে 
যেন কোনো গুপ্ত সংবাদের জন্য ছটফটানি 
- পুরুষ দূরত্বে যাও, কবি কাছে এসো 
তোমায় কী দিতে পারি ?
 
- কিছু নয় ! 
- অভিমান ? 
- নাম দাও অভিমান ! 
- এটা কিন্তু বেশ ! যদি 
অসুখের নাম দিই নির্বাসন 
না-দেখার নাম দিই অনস্তিত্ব 
দূরত্বের নাম দিই অভিমান ?
 
- কতটুকু দূরত্ব ? কী, মনে পড়ে ? 
- কী করে ভাবলে যে ভুলবো ? 
- তুমি এই যে বসে আছো, আঙুলে ছোঁয়ানো থুতনি 
কপালে পড়েছে চূর্ণ চুল 
পাড়ের নক্সায় ঢাকা পা 
ওষ্ঠাগ্রে আসন্ন হাসি 
এই দৃশ্যে অমরত্ব 
তুমি তো জানো না, নীরা, 
আমার মৃত্যুর পরও এই ছবি থেকে যাবে । 
- সময় কি থেমে থাকবে ? কী চাও আমার কাছে ? 
- মৃত্যু ? 
-ছিঃ , বলতে নেই 
- তবে স্নেহ ? আমি বড় স্নেহের কাঙাল 
- পাওনি কি ? 
- বুঝতে পারি না ঠিক । বয়স্ক পুরুষ যদি স্নেহ চায় 
শরীরও সে চায় 
তার গালে গাল চেপে দিতে পারো মধুর উত্তাপ ? 
- ফের পাগলামি ? 
- দেখা দাও । 
- আমিও তোমায় দেখতে চাই । 
- না ! 
- কেন ? 
- বোলো না । কক্ষনো বোলো না আর ঐ কথা 
আমি ভয় পাবো । 
এ শুধুই এক দিকের 
আমি কে ? সামান্য, অতি নগণ্য, কেউ না 
তবু এত স্পর্ধা করে তোমার রূপের কাছে... 
- তুমি কবি ? 
- তা কি মনে থাকে ? বারবার ভুলে যাই 
অবুঝ পুরুষ হয়ে কৃপাপ্রার্থী 
- কী চাও আমার কাছে ? 
- কিছু নয় । আমার দু'চোখে যদি ধুলো পড়ে 
আঁচলের ভাপ দিয়ে মুছে দেবে ?

পরানের গহীন ভিতর

সৈয়দ শামসুল হক




জামার ভিতর থিকা যাদুমন্ত্রে বারায় ডাহুক,
চুলের ভিতর থিকা আকবর বাদশার মোহর,
মানুষ বেবাক চুপ, হাটবারে সকলে দেখুক
কেমন মোচর দিয়া টাকা নিয়া যায় বাজিকর।
চক্ষের ভিতর থিকা সোহাগের পাখিরে উড়াও,
বুকের ভিতর থিকা পিরীতের পুন্নিমার চান,
নিজেই তাজ্জব তুমি একদিকে যাইবার চাও
অথচ আরেক দিকে খুব জোরে দেয় কেউ টান।
সে তোমার পাওনার এতটুকু পরোয়া করে না,
খেলা যে দেখায় তার দ্যাখানের ইচ্ছায় দেখায়,
ডাহুক উড়াইয়া দিয়া তারপর আবার ধরে না,
সোনার মোহর তার পড়ে থাকে পথের ধুলায়।
এ বড় দারুণ বাজি, তারে কই বড় বাজিকর
যে তার রুমাল নাড়ে পরানের গহীন ভিতর।।


আন্ধার তোরঙ্গে তুমি সারাদিন কর কি তালাশ?
মেঘের ভিতর তুমি দ্যাখ কোন পাখির চক্কর?
এমন সরল পথ তবু ক্যান পাথরে টক্কর?
সোনার সংসার থুয়া পাথারের পরে কর বাস?
কি কামে তোমার মন লাগে না এ বাণিজ্যের হাটে?
তোমার সাক্ষাৎ পাই যেইখানে দারুণ বিরান,
ছায়া দিয়া ঘেরা আছে পরিস্কার তোমার উঠান
অথচ বেবাক দেখি শোয়া আছে মরনের খাটে।
নিঝুম জঙ্গলে তুমি শুনছিলা ধনেশের ডাক?
হঠাৎ আছাড় দিয়া পড়ছিল রূপার বাসন?
জলপির গাছে এক কুড়ালের কোপের মতন
তাই কি তোমার দেহে ল্যাখা তিন বাইন তালাক?
এমন বৃক্ষ কি নাই, যার ডালে নাই কোন পরী?
এমন নদী কি নাই, যার বুকে নাই কোন তরী?


সে কোন বাটিতে কও দিয়াছিলা এমন চুমুক
নীল হয়া গ্যাছে ঠোঁট, হাত পাও শরীল অবশ,
অথচ চাও না তুমি এই ব্যাধি কখনো সারুক।
আমার জানতে সাধ, ছিল কোন পাতার সে রস?
সে পাতা পানের পাতা মানুষের হিয়ার আকার?
নাকি সে আমের পাতা বড় কচি ঠোঁটের মতন?
অথবা বটের পাতা অবিকল মুখের গড়ন?
তুঁতের পাতা কি তয়, বিষনিম, নাকি ধুতুরার?
কতবার গেছি আমি গেরামের শ্যাষ সীমানায়
আদাড় বাদার দিয়া অতিঘোর গহীন ভিতরে,
কত না গাছের পাতা কতবার দিয়াছি জিহ্বায়,
এমন তো পড়ে নাই পানি এই পরানে, শিকড়ে।
তয় কি অচিন বৃক্ষ তুমি সেই ভুবনে আমার,
আমারে দিয়াছো ব্যাধি, নিরাময় অসম্ভব যার?





আমি কার কাছে গিয়া জিগামু সে দুঃখ দ্যায় ক্যান,
ক্যান এত তপ্ত কথা কয়, ক্যান পাশ ফিরা শোয়,
ঘরের বিছান নিয়া ক্যান অন্য ধানখ্যাত রোয়?
অথচ বিয়ার আগে আমি তার আছিলাম ধ্যান।
আছিলাম ঘুমের ভিতরে তার য্যান জলপিপি,
বাঁশির লহরে ডোবা পরানের ঘাসের ভিতরে,
এখন শুকনা পাতা উঠানের পরে খেলা করে,
এখন সংসার ভরা ইন্দুরের বড় বড় ঢিপি।
মানুষ এমন ভাবে বদলায়া যায়, ক্যান যায়?
পুন্নিমার চান হয় অমাবস্যা কিভাবে আবার?
সাধের পিনিস ক্যান রঙচটা রদ্দুরে শুকায়?
সিন্দুরমতির মেলা হয় ক্যান বিরান পাথার?
মানুষ এমন তয়, একবার পাইবার পর
নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর।।


তোমার দ্যাশের দিকে ইস্টিশানে গেলেই তো গাড়ি
সকাল বিকাল আসে, এক দন্ড খাড়ায়া চম্পট,
কত লোক কত কামে দূরে যায়, ফিরা আসে বাড়ি-
আমার আসন নাই, যাওনেরও দারুন সংকট।
আসুম? আসার মতো আমি কোনো ঘর দেখি নাই।
যামু যে? কোথায় যামু, বদলায়া গ্যাছে যে বেবাক।
কেমন তাজ্জব সব পাল্টায়া যায় আমি তাই
দেইখাছি চিরকাল। পরানের ভিতরে সুরাখ-
সেখানে কেবল এক ফরফর শব্দ শোনা যায়,
পাখিরা উড়াল দিয়া গ্যাছে গিয়া, এখন বিরান,
এখন যতই আমি ছড়া দেই কালিজিরা ধান,
সে কি আর আঙিনায় ফিরা আসে? আর কি সে খায়?
সকাল বিকাল গাড়ি, চক্ষু আছে তাই চক্ষে পড়ে;
পলকে পলকে গাড়ি সারাদিন মনের ভিতরে।।


তোমার খামাচির দাগ এখনো কি টকটাকা লাল,
এখনো জ্বলন তার চোৎরার পাতার লাহান।
শয়তান, দ্যাখো না করছ কি তুমি কি সোন্দর গাল,
না হয় দুপুর বেলা একবার দিছিলাম টান?
না হয় উঠানে ছিল লোকজন কামের মানুষ,
চুলায় আছিল ভাত, পোলাপান পিছের বাগানে,
তোমারে পরান দিছি, তাই বইলা দেই নাই হুঁশ,
আমি তো তোমারে নিতে চাই নাই ঘরের বিছানে।
হ, জানি নিজের কাছে কোনো কথা থাকে না গোপন।
দিনের দুফুর বেলা যেই তুমি আসছিলা ঘরে
আতখা এমন মনে হইছিল- আন্ধার যেমন,
আতখা এমন ছায়া সোহাগের আর্শির ভিতরে।
আবার ডাকলে পরে কিছুতেই স্বীকার হমু না।
বুকের পাষাণ নিয়া দিমু ডুব শীতল যমুনা।।


নদীর কিনারে গিয়া দেখি নাও নিয়া গ্যাছে কেউ
অথচ এই তো বান্ধা আছিল সে বিকাল বেলায়।
আমার অস্থির করে বুঝি না কে এমন খেলায়,
আমার বেবাক নিয়া শান্তি নাই, পাচে পাছে ফেউ।
পানির ভিতরে য্যান ঘুন্নি দিয়া খিলখিল হাসে
যত চোর যুবতীরা, গ্যারামের শ্যাষ সীমানায়
বটের বৈরাগী চুল, ম্যাঘে চিল হারায় বারায়,
বুকের ভিতরে শিস দিয়া সন্ধা হাঁটে আশেপাশে।
এখন কোথায় যাই, এইখানে বড় সুনসান,
মানুষের দুঃখ আছে, জগতের আছে কিনা জানি না-
জগৎ এমনভাবে হয়া যায় হঠাৎ অচিনা।
মনে হয় আমার থিকাও একা বৃক্ষের পরান,
আমার থিকাও দুঃখী যমুনার নদীর কিনার।
আমার তো গ্যাছে এক, কত কোটি লক্ষ গ্যাছে তার।।


আমারে তলব দিও দ্যাখো যদি দুঃখের কাফন
তোমারে পিন্ধায়া কেউ অন্যখানে যাইবার চায়
মানুষ কি জানে ক্যান মোচড়ায় মানুষের মন,
অহেতুক দুঃখ দিয়া কেউ ক্যান এত সুখ পায়?
নদীরে জীবন কই, সেই নদী জল্লাদের মতো
ক্যান শস্য বাড়িঘর জননীর শিশুরে ডুবায়?
যে তারে পরান কই, সেই ব্যাক্তি পাইকের মতো
আমার উঠানে ক্যান নিলামের ঢোলে বাড়ি দ্যায়?
যে পারে উত্তর দিতে তার খোঁজে দিছি এ জীবন,
দ্যাখা তার পাই নাই, জানা নাই কি এর উত্তর।
জানে কেউ? যে তুমি আমার সুখ, তুমিই কি পারো
আমারে না দুঃখ দিয়া? একবার দেখি না কেমন?
কেমন না যায়া তুমি পারো দেখি অপরের ঘর?-
অপর সন্ধান করে চিরকাল অন্য ঘর কারো।।


একবার চাই এক চিক্কুর দিবার, দিমু তয়?
জিগাই কিসের সুখে দুঃখ নিয়া তুমি কর ঘর?
আঙিনার পাড়ে ফুলগাছ দিলে কি সোন্দর হয়,
দুঃখের কুসুম ঘিরা থাকে যার, জীয়ন্তে কবর।
পাথারে বৃক্ষের তরে ঘন ছায়া জুড়ায় পরান,
গাঙের ভিতরে মাছ সারাদিন সাঁতরায় সুখে,
বাসরের পরে ছায়া য্যান দেহে গোক্ষুর জড়ান,
উদাস সংসারে ব্যথা সারাদিন ঘাই দেয় বুকে।
তবুও সংসার নিয়া তারে নিয়া তুমি কি পাগল,
তোলো লালশাক মাঠে, ফসফস কোটো পুঁটিমাছ,
সাধের ব্যাঞ্জন করো, রান্ধো ক্ষীর পুড়ায়া আঞ্চল,
বিকাল বেলায় কর কুঙ্কুমের ফোঁটা দিয়া সাজ।
ইচ্ছা করে টান দিয়া নিয়া যাই তোমারে রান্ধুনি,
তোমার সুতায় আমি একখান নীল শাড়ি বুনি।।

১০
কে য্যান কানতে আছে- তার শব্দ পাওয়া যায় কানে,
নদীও শুকায়া যায়, আকালের বাতাস ফোঁপায়,
মানুষেরা বাড়িঘর বানায় না আর এই খানে,
গোক্ষুর লতায়া ওঠে যুবতীর চুলের খোঁপায়।
বুকের ভিতর থিকা লাফ দিয়া ওঠে যে চিক্কুর,
আমি তার সাথে দেই শিমুলের ফুলের তুলনা,
নিথর দুফুর বেলা, মরা পাখি, রবি কি নিষ্ঠুর,
আগুন লাগায়া দিবে, হবে খাক, তারি এ সূচনা।
অথচ আমারে কও একদিন এরও শ্যাষ আছে-
আষাঢ়ের পুন্নিমার আশা আর এ দ্যাশে করি না,
চক্ষু যে খাবলা দিয়া খায় সেই পাখি বসা গাছে,
অথচ খাড়ায়া থাকি, এক পাও কোথাও নড়ি না।
সকল কলস আমি কালঘাটে শূণ্য দেইখাছি,
তারে না দেইখাছি তাই দ্যাখনের চক্ষু দিতে রাজি।।

১১
কি আছে তোমার দ্যাশে? নদী আছে? আছে নাকি ঘর?
ঘরের ভিতরে আছে পরানের নিকটে যে থাকে?
উত্তর সিথানে গাছ, সেই গাছে পাখির কোটর
আছে নাকি? পাখিরা কি মানুষের গলা নিয়া ডাকে?
যখন তোমার দ্যাখা জানা নাই পাবো কি পাবো না,
যখন গাছের তলে এই দেহ দিবে কালঘুম,
যখন ফুরায়া যাবে জীবনে নীল শাড়ি বোনা,
তখন কি তারা সব কয়া দিবে আগাম-নিগুম?
আমার তো দ্যাশ নাই, নদী নাই, ঘর নাই, লোক,
আমার বিছানে নাই সোহাগের তাঁতের চাদর,
আমার বেড়ায় খালি ইন্দুরের বড় বর ফোক,
আমার বেবাক ফুল কাফনের ইরানি আতর।
তোমার কি সাধ্য আছে নিয়া যাও এইখান থিকা,
আমার জীবন নিয়া করো তুমি সাতনরী ছিকা?

১২
উঠানের সেই দিকে আন্ধারের ইয়া লম্বা লাশ,
শিমের মাচার নিচে জোছনার সাপের ছলম,
পরীরা সন্ধান করে যুবতীর ফুলের কলম,
তারার ভিতরে এক ধুনকার ধুনায় কাপাশ,
আকাশে দোলায় কার বিবাহের রুপার বাসন,
গাবের বাবরি চুল আলখেল্লা পরা বয়াতির,
গাভির ওলান দিয়া ক্ষীণ ধারে পড়তাছে ক্ষীর,
দুই গাঙ্গ এক হয়া যাইতাছে- কান্দন, হাসন।
একবার আসবা না?- তোমারেও ডাক দিতে আছে
যে তুমি দুঃখের দিকে একা একা যোজন গিয়াছো?
একবার দেখবা না তোমারেও ডাক দিতে আছে
যে তুমি আঘাত নিয়া সারাদিন কি তফাত আছো?
যে নাই সে নাই সই, তাই সই, যা আছে তা আছে,
এমন পুন্নিমা আইজ, কোন দুঃখে দুয়ার দিয়াছো?

১৩
তোমার বিয়ার দিন মনে হইল, সত্য নিও মনে,
এত বড় এত গোল কোনোদিন দেখি নাই চান।
তুলার মতন ফুল, রাণী য্যান দরবারে বসা,
নদীর গহীন তলে জোছনায় দিয়া সে প্রাসাদ।
পাথারে নিরালা গাছ আলগোছে একখানা হাত
আমার আন্ধার পিঠে দিয়া কয়, 'তোমারে সহসা
দেখাই কিভবে সব মানুষের নিজের বানান,
পরীর সাক্ষাৎ নাই গেরস্তের বাড়ির পিছনে।'
দিঘল নায়ের মতো দুঃখ এক নদী দিয়া যায়-
মাঝি নাই, ছই নাই, নাই কোনো কেরায়া কি লোক।
না হয় অনেকে কয়- এক গেলে অন্য আর আসে,
অন্যের মধ্যে কি সেই পরানের এক পাওয়া যায়?-
তাই না সচ্ছল দ্যাশ অথচ কি বিরান সড়ক।
মানুষ বোঝে না বইলা পুন্নিমার চান এত হাসে।।

১৪
কি কামে মানুষ দ্যাখে মানুষের বুকের ভিতরে
নীল এক আসমান- তার তলে যমুনার ঢল,
যখন সে দেখে তার পরানের গহীন শিকড়ে
এমন কঠিন টান আচানক পড়ে সে চঞ্চল?
কিসের সন্ধান করে মানুষের ভিতরে মানুষ?
এমন কি কথা আছে কারো কাছে না কইলে নাই?
সুখের সকল দানা কি কামে যে হইয়া যায় তুষ?
জানি নাই, বুঝি নাই, যমুনারও বুঝি তল নাই।
তয় কি বৃক্ষের কাছে যামু আমি? তাই যাই তয়?
বনের পশুর কাছে জোড়া জোড়া আছে যে গহীনে?
যা পারে জবাব দিতে, গিয়া দেখি শূণ্য তার পাড়া,
একবার নিয়া আসে আকালের কঠিন সময়,
আবার ভাসায় ঢলে খ্যাতমাঠ শুকনার দিনে,
আমার আন্ধার নিয়া দেয় না সে একটাও তারা।

১৫
আমারে সোন্দর তুমি কও নাই কোনো একদিন,
আমার হাতের পিঠা কও নাই কি রকম মিঠা,
সেই তুমি তোমারেই দিছি আমি যুবতীর চিন-
চোখ-কানা দেখ নাই বিছানায় আছে লাল-ছিটা?
তয় কি তোমারে আমি ফাঁকি দিয়া পিছন বাড়িতে
যামু তার কাছে কও আমারে যে দিতে যায় পান?
অথবা জিগার ডালে ফাঁসি নিয়া নিজের শাড়িতে
ভূত হয়া তোমার গামছায় দিমু আন্ধারে টান?
তখন আমারে তুমি দেখি হেলা করো কি রকম,
শরীল পাথর হয়া যায় কি না পানের ছোবলে,
আমারে হারায়া দেখি জমিহারা চাষী হও কি না?
এমন দেখতে বড় সাধ হয় আল্লার কসম,
দেখার বাসনা করে কালপোকা তোমার ফসলে,
অথচ ঘরেই থাকি, পোড়া ঘরে থাকতে পারি না।।

১৬
যমুনার পারে আসলে তার কথা খালি মনে হয়,
এমন পরান পড়ে- সব কিছু বিকাল-বিকাল,
লোকের চেহারা দেখি, হাত নাড়ে, নাড়ে তারা পাও,
কথা কয়, তাও বোঝা যায় না যে কি কয় কি কয়।
চক্ষের ভিতরে নাচে হাটবারে বাঁওহাতি খাল,
নায়ের উপরে দাগ- একদিন রাখছিল পাও।
জলে ভেঁজা, কত বর্ষা গ্রীষ্মকাল গ্যাছে তারপর,
কতবার নাও নিয়া পাড়ি দিছি এ কুল ও কুল,
তাও সেই পাড় আমি চিনি নাই, দেখি নাই গাঙ্গে।
বুকের ভিতরে ঢেলা সারাদিন কিষানেরা ভাঙ্গে,
রাখাল নষ্টামি করে, পড়ে লাল শিমুলের ফুল,
জলের ভিতরে নড়ে মনে বান্ধা আছিল যে ঘরে।
কইছিল সে আমারে- সেই পাড়ে নিবা না আমারে?
কোন পাড়? ইচ্ছা তার আছিল সে যায় কোন পাড়ে?

১৭
এমন অদ্ভুতভাবে কথা কয়া ওঠে কে, আন্ধারে?-
য্যান এক উত্তরের ধলাহাঁস দক্ষিণের টানে
যাইতে যাইতে শ্যাষে শুকনা এক নদীর কিনারে
ডাক দিয়া ওঠে, ‘আগো, চেনা কেউ আছো কোনোখানে?’
আমি তো নিরালা মনে আছিলাম আমার সংসারে,
তার সেই ডাক, সেই কান্দনের আওয়াজটা কানে
যাইতেই দেখি য্যান একা আমি চৈতের পাথারে-
আমারে আমার সব নিদারুণ তীর হয়া হানে।
আমি তা্রে কি দিব উত্তর? তারে কোন কথা কই?
সে ক্যান আমারে ডাক দিয়া গেল, বুঝিনা ইয়াও।
আমি কি করবার পারি? কতটুকু ক্ষমতা আমার?
উপস্থিত মনে হয়, তারে আমি ডাক দিয়া লই,
ঝাপাইয়া ছিনতাই করি যমুনার ছিপছিপা নাও,
সকল ফালায়া দিয়া নিরুদ্দেশ সাথে যাই তার।।

১৮
এ কেমন শব্দ, এ কেমন কথার আদব?
কাতারে কাতার খাড়া, আমি তার ভেদ বুঝি নাই।
নিজের চিন্তার পাখি উড়ায়া যে দিমু কি তাজ্জব,
খানিক হুকুম মানে, তারপর বেবাক নাজাই।
শব্দের ভিতর থিকা মনে হয় শুনি কার স্বর,
একজন, দুইজন, দশজন, হাজার হাজার-
আমার মতন যারা ছিল এই মাটির উপর,
এখন কবরে গ্যাছে, করি আমি তাদেরই বাজার।
এরেই বন্ধন কয়? এর থিকা মুক্তি কারো নাই।
যখনি তোমার ভাষা আমি কই, তুমি ওঠো কয়া,
আমার মূর্তির মুখ আলগোছে বদলায়া দ্যাও।
যদিবা চেতনা পায়া কিছু করি হাতে লাগে ছ্যাও।
আসলে তোমার মতো এতখানি কেউ না নিদয়া,
যার দ্যাশ তার দ্যাশে চলে তার নিজের টাকাই।।

১৯
পথের উপরে এক বাজপড়া তালগাছ খাড়া,
পিছের জঙ্গল থিকা কুড়ালের শব্দ শোনা যায়,
যমুনার জলে দ্যাখে নাও তার নিজের চেহারা,
বাতাসের কোলে মাথা কুশালের ফসল ঘুমায়,
ধুলায় চক্কর দিয়া খেলা করে বিরান পাথার,
তুলার অনেকগুলা ফুল আটকা জিগার আঠায়,
দমের ভিতরে থামা বুকরঙ্গি মাছের কাতার,
আতখা বেবাক য্যান গিয়া পড়ছে অচিনঘাটায়।
আমিও সেবার এক সুনসানে গিয়া পড়ছিলাম-
য্যান সব টান দিয়া নিয়া গ্যাছে সে কার বারুন,
যেইদিকে চাই দেখি ভয়ানক নিঝুম নিথর,
নিয়া গ্যাছে নাম ধাম আর ইচ্ছার নায়ের বাদাম,
অঙ্গের কুসুম নিয়া খেলা করছে দুফর দারুণ,
যেদিন ফালায়া গেল আমারে সে আমার ভিতর।।

২০
কি কামে দুফর বেলা পাতাগুলা উড়ায় বাতাস?
আবার সে কার স্বর মাঠাপাড়ে ফোঁপায় এমন?
কি কামে আমার চক্ষে পড়ে খালি মানুষের লাশ?
যা দ্যাখার দেইখাছি, বাকি আছে আর কি দ্যাখন?
সময় দেখায়া গ্যাছে বাল্যকালে আমের সুঘ্রাণে?
যৈবন অন্যের হাতে য্যান এক কাচের বাসন,
দুঃখের পাখিরে আমি দেইখাছি বিয়ার বিহানে,
কিভাবে কালির লেখা হয়া যায় জলের লিখন।
আমারে ছাড়ান দিয়া যায় না সে যেখানেই যাই,
দ্যাশ কি বিদ্যাশ কও, চিনা কিংবা অচিনাই হও,
দুঃখের বাদাম তোলা সেই এক নাও সব গাঙ্গে।
পালায়া নিস্তার কই? সবখানে সেই না শানাই।
যেইখানেই যাই গিয়া, খাড়া দেখি সেই শও শও
পুয়ারন মিস্তিরি- তারা মনোযোগ দিয়া সব ভাঙ্গে।।

২১
হাজার দক্ষিণ দিকে যাও তুমি গাঙ্গের মোহানা
পাও যদি কইও আমারে। আমি না অনেক দিন
আমার যৈবন আমি মোহানার খোঁজে না দিলাম,
তাও তারে দেখি নাই, শুনি আছে ধলা গাঙচিল,
মাছের পাহারা ঘেরা খিজিরের অতল আস্তানা,
আছে তার ইশারায় আগুনের দেহ এক জ্বীন-
যদি ইচ্ছা করে তার অসম্ভব নাই কোন কাম,
যারে না পাইতে পারি তারো সাথে দিতে পারে মিল।
তুমি যে মনের মতো ঘরে আছো এই কথা কও-
সেই ভাগ্য মনে হয় খিজিরের বিশেষ অছিলা।
আমার হিসাবে কয়- মানুষের সাধ্য নাই পায়।
যতই সাধনা কর, পরানের যত কাছে রও
সে জন দুরেই থাকে, তুমি থাকো যেখানে আছিলা।
আমার জানতে সাধ, মোহানায় গ্যাছে কোন নায়।।

২২
এক্কেরে আওয়াজ নাই, নদী খালি চাপড় দিতাছে
গেরামের পিঠে আর ফিসফাস কইতাছে, ‘ঘুম,
ঘুমারে এখনতরি সাতভাই পূর্বদিকে আছে।‘
এক ফোঁটা ঘুম যে আসে না তার আমি কি করুম?
অখনো খেজুরগাছে টুপটুপ রস পড়তে আছে,
এত যে কান্দন আছে- তয় চক্ষু ভেজে না কেমন?
ঘাটের যুগল নাও য্যান ঠোঁটে ঠোঁট দিয়া আছে,
আমার দক্ষিণ পাশে সরে নাই চান্দের গেরন।
আধান শীতলপাটি ভরা এক আমাবস্যা নিয়া
দেখি রোজ উত্তরের একদল ধলাহাঁস নামে,
বুকের ভিতরে চুপ, তারপর আতখা উড়াল-
এ দ্যাশে মানুষ নাই, অন্যখানে তাই যায় গিয়া।
এখানে কিসের বাড়ি? এত দ্রব্য আসে কোন কামে?
কেউ না দেখুক, তারা দেইখাছে দুঃখের কুড়াল।।

২৩
আমারে যেদিন তুমি ডাক দিলা তোমার ভাষায়
মনে হইল এ কোন পাখির দ্যাশে গিয়া পড়লাম,
এ কোন নদীর বুকে এতগুলা নায়ের বাদাম,
এত যে অচিন বৃক্ষ এতদিন আছিল কোথায়?
আমার সর্বাঙ্গে দেখি পাখিদের রাতির পালক,
নায়ের ভিতর থিকা ডাক দ্যায় আমারে ভুবন,
আমার শরীলে য্যান শুরু হয় বৃক্ষের রোপণ,
আসলে ভাষাই হইল একমাত্র ভাবের পালক।
তাই আমি অন্যখানে বহুদিন ছিলাম যদিও,
যেদিন আমারে তুমি ডাক দিলা নিরালা দুফর,
চক্ষের পলকে গেল পালটায়া পুরানা সে ঘর,
তার সাথে এতকাল আছিল যে ভাবের সাথীও।
এখন আমার ঠোঁটে শুনি আমি অন্য এক স্বর,
ভাষাই আপন করে আর সেই ভাষা করে পর।।

২৪
আবার তোমার কোলে ফিরা যায় তোমার সন্তান,
আবার তোমার কোলে, খালি কোল, উথলায়া পড়ে
দুধের ঘেরানে ভরা, জননী গো, পুন্নিমার চান-
আবার সে ঘরে ফিরা আইসাছে সারাদিন পরে।
আবার সে আইসাছে করালের ঘুম চক্ষে নিয়া,
চক্ষের ভিতরে তার গেরেপ্তার বিহানের সোনা,
তবনের নীল খোপে শিমুলের লাল রঙ নিয়া,
আবার সে আইসাছে, জননী গো, তুমি কাইন্দো না।
তোমার সন্তান গ্যাছে জননী গো, সে আমার না ভাই,
আমার দেহের থিকা একখানা কাটা গ্যাছে হাত,
উঠানে খাড়ায়া আছি, খুলবা না তোমার দুয়ার?
আমার মতন যারা হারায়াছে আইজ তার ভাই,
য্যান শিলাবিষ্টি শ্যাষে পরিস্কার আকাশ হঠাৎ ,
হাজার হাজার তারা ঘিরা আছে পুন্নিমা তোমার।।

২৫
কত না দুধের ক্ষীর খায়া গ্যাছে কালের গোপাল,
কতবার কত রোয়া কারবালা খ্যাতের খরায়,
কন না রঙিলা নাও নিয়া গ্যাছে কাল যমুনায়,
অঘোরে হারায়া গাভি ফেরে নাই নিজস্ব রাখাল।
কত না পুকুর দিতে পারে নাই পানি গ্রীষ্মকালে,
বাসকের ছাল কত ভালো করতে পারে নাই রোগ,
দেহের কত না রক্ত খায়া গ্যাছে কত ছিনাজোঁক,
কুসুম উধাও হয়া গ্যাছে কত শিমুলের ডালে।
তাই কি ছাড়ান দিমু বিহানের ধবল দোহান?
কামারের কাছে বান্ধা দিমু এই রূপার লাঙ্গল?
আমার বৃক্ষেরে তাই দিতে কমু জহরের ফল?
বাদ দিয়া দিমু কও পরানের গহীন কথন?
আমার তিস্তারে দেখি, সেও পোষ মানে না ভাটিতে,
কি তার উথাল নাচ গেরস্তের সমান মাটিতে!

২৬
ক্যান তুই গিয়াছিলি?- আমি তরে জিগামু অখন
চান্দের ভিতর ফের, যেইখানে জটিলতা বাড়ে,
অশথ জড়ায়া থাকে নদী নিয়া জলের কিনারে,
আমার গেরাম ঘিরা যেইখানে খালি পলায়ন-
মানুষের, মানুষের, আর তর চক্ষের কাজল,
যেইখানে মেলা দেয় একখান সুনসান নাও,
যে নায়ে সোয়ার নাই, ‘কেডা যাও, কেডা বায়া যাও?’
বেকল আছাড় দিয়া ওঠে কালা যমুনার জল?
কেউ নাই, কেউ তর নাই, তুই নিজেই জানস,
তবু ক্যান গিয়াছিলি? ক্যান তুই দিয়াছিলি ফাল?
কিসের কি বাদ্যে তর রক্ত করে উথাল পাথাল
আমারে ক’ দেখি তুই? ক’না দেখি, কি চিল মানস?
ল’যাই জলের ধারে দ্যাখ ছায়া আমার কি তর?
মানুষে মানুষে নাই কোনো ভেদ দুঃখের ভিতর।।

২৭
আউসের খ্যাতে মাঠে যুবতীরা দিতাছে সাঁতার,
দ্যাখো না কেমন তারা চিতলের মতো খেলা করে,
কি তারা তালাশ করে দিনমান নাগর ভাতার-
যারা ডুব দিয়া আছে এই ধান বানের সাগরে;
বিছনের মতো পড়ে তারাবাজি চুমার চুমার,
কি ঘাই আতখা মারে খলবল এই হাসে তারা
একজন দুইজন সাতজন নাকি বেশুমার
বুকের ভিতরে ভাঙ্গে নিশীথের শরমের পাড়া।
আমি যেই সেইখানে আচানক গিয়া পড়লাম
চক্ষের নিমেষে তারা নাই আর কোনোখানে নাই,
আমি যেই সেইখানে তোমারেনি খোঁজ করলাম-
কিছু না দেইখা নিজে বেয়াকুফ বড় শরমাই।
এই ছিল এই নাই, কই গেল, কই যার তারা?
বেমালুম কই তুমি যাও গিয়া খা’বের ইশারা?

২৮
ঝকঝক ঝকঝক সারাদিন করে আয়নাটা-
বুকে নাই ছবি নাই পড়ে নাই একখানা ছবি,
বেবাক একাকী য্যান সুনসান ইস্কুরুপে আঁটা,
যা চাই তা নাই তয় চমৎকার আছে আর সবি।
আছে সবি আছে এক মইষের শিঙ্গের চিরুনি,
রুমাল, চুলের ফিতা জবজবা এখনোনি ত্যালে।
বিবাহের বাসরে শ্যাষ য্যান গেছে সে ফিরুনি-
ফেরার আশাও নাই, ফেরা নাই একবার গ্যালে।
গেছে তো আমারে যদি বেরহম নিয়া যায় সাথে,
আমি তো এমন ঘরে বাস করি আশা করি নাই;
য্যান হাত দিয়া আছি ইন্দুরের বিষআলা ভাতে,
তবু তো ধরে না বিষ মুখে তুলি যত লোকমাই।
নিজেরও পড়ে না ছবিকাটা সেই আয়নায়,
সে নাই চেহারা নাই, খালি বড় খালি তড়পায়।।

২৯
তোমারে যে ভালোবাসে এর থিকা আরো পাঁচগুন
আল্লার কসম আমি দিমু তারে এই জামাখান,
আমার কলম আমি দিমু তারে, শরীলের খুন
দোয়াত ভরায়া দিমু, অনুরোধ খালি একখান-
সে য্যান আমার থিকা আরো ভালো পদ্য লেখে আর
যাদুমন্ত্রে রূপার শিকল হাতে দিতে পারে তার।
তোমারে যে ভালোবাসে এর থিকা আরো দশগুন
আল্লার কসম আমি দিমু তারে এই বাড়িখান,
আমার উঠান আমি দিমু তারে, শীতের আগুন-
নিজেই সাজায়া দিমু, অনুরোধ খালি একখান-
সে য্যান আমার থিকা আরো ভালো নিদ্রা যায় আর
তারেই নিকটে পায় কথা যার নিকটে থাকার।
নচেৎ নষ্টামি জানি, যদি পাছ না ছাড়ে আমার,
গাঙ্গেতে চুবান দিয়া তারে আমি শুকাবো আবার।।

৩০
আরে ও ইসের বেটি, চুলে দিয়া শিমুলের ফুল
যাস কই, কই যাস? যুবকের মাঝখান দিয়া?
মানুষ গাঙ্গের মতো, বানে ভাসে তারো দুই কুল-
সে পানি কাতান বড়, খলবল রঙ তার সিয়া।
আরে থাম, কই যাস? তবু যায় ঘুরনান দিয়া?
শিমুল যতই লাল সেই লাল তবু কিছু কম
যত লাল যেইখানে দেহ তর লুকায় শরম।
খাড়া না করুক দেখি একবার কেউ তরে বিয়া।
বেবাক পানির টান সেইকালে নরোম সোঁতায়,
তখন পরীর রানী সেও কিনা অতি বাধ্য বশ,
তখন দেখিনা তুই আইলের বেড়া নি ভাঙ্গস,
তখন শরম দেখি থাকে তর কেমন কোথায়?
নষ্ট তর পায়ে পায়ে স্বন্নলতা আনন্তের মূল,
দিবিনে তখন তুই সিঙ্গারের আসল মাশুল।।

৩১
কে করে পরশ তার জীবনের এত জটিলতা?
তোমার অধিক টান দেয় বৃক্ষ দেয় বিষলতা;
একবার আমারে আছাড় দিয়া সোজা করে ফের,
আমারই মতন যারা বেশুমার সন্তান মায়ের।
কিসে যে চালনা করে এই দেহ এই ভবিষ্যৎ-
কিছুই বুঝি না, দেখি আচানক শেষ হয় পথ;
যে পথেই মেলা দেই সেই পথে ভয়ানক ভুত-
এ বড় কঠিন জাগা, বসবাস বড়ই অদ্ভুত।
তয় কি ছাড়ান দিমু হাতে ধরা শেষ রশিখান?
তয় কি পাথারে দিমু হাতে ধরা বেঘোরে পরান?
নাকি তুমি একবার হাত দিয়া ডাক দিবা কাছে
আমারেও আমার মতন যারা একা একা আছে,
সকলেরে একজোট কইরা নি তুলবা আবার?
তোমার নিকটে রাখি নিদানের এই দরবার।।

৩২
নিঝুম জঙ্গল দিয়া যাইতেই ধনেশের ডাক।
যেমন আতখা ভাঙ্গে কাঠুরার বুকের কাছাড়
চক্ষের পলকে তুমি দেখা দিয়া করো মেছমার;
রতির আগুনে সব দাউদাউ, পরিণামে খাক
আমার এ দেহ বটে, ভবিষ্যৎ পায় না নিস্তার;
সকল কিছুর পরে দ্যাও তুমি উড়ায়া বাদাম,
তীরের মতন তারা ধায়া যায় কও কোন ধাম?
বরং তোমার থিকা দয়াবতী জোয়ার নিস্তার।
তবুও আবার আমি ধনেশের মতো দিয়া ডাক
আবার পাথার বন পথ ঘাট বাজার সংসার
তালাশ করুম আর গাভীনের করুম সন্ধান,
আবার দেখুম আমি ছাই-পোকা মাজরার ঝাঁক
কিভাবে আমার খ্যাত করে সব শস্য ছারখার,
আবারো বুনুম আমি এই খ্যাতে কাউনের ধান।।

৩৩

এমন বৃক্ষ কি নাই ডালে যার নাই কোন পরী,

এমন নদী কি নাই জলে যার পড়ে না চেহারা,

এমন যাত্রা কি নাই যাতে নাই পবনের তরী,

এমন ডুলি কি নাই যাতে নাই নিষেধের ঘেরা,

এমন নারী কি নাই বুকে যার নাই ভালোবাসা,

এমন পত্র কি নাই বাক্যে যার নাই নিরাময়,

এমন শস্য কি নাই যার বীজ বোনে নাই চাষা,
এমন মৃত্যু কি নাই যাতে নাই খোয়াবের লয়?
এমন কি রূপ আছে রূপ যার গড়ে না কুমার,
এমন কি দেখা আছে দেখা যার চোখে না কুলায়,
এমন কি কথা আছে কথা যার থাকে না ধুলায়,
এমন কি নেশা আছে নেশা যার অধিক চুমার?
পরানে পরান যদি এই মতো হাজার সোয়াল
সারাদিন যমুনায় খলবল বিতল বোয়াল।।

কথোপকথন ৩৩

- পুর্ণেন্দু পত্রী

খবর্দার! হাত সরিয়ে নাও।
ব্যাগে ভরে নাও টাকাগুলো
আজ সমস্ত কিছুর দাম দেবো আমি।
কী হচ্ছে কি শুভঙ্কর? কেন এমন পাগলামির ডেউয়ে দুলছো?
এই জন্যেই তোমার উপর রাগ হয় এমন।
মাঝে মাঝে অর্থমন্ত্রীদের মতো গোঁয়ার হয়ে ওঠো তুমি।
কাল কতবার বলেছিলুম, চলো উঠি, চলো উঠি।
আকাশ আলকাতরা হয়ে আসছে, চলো, উঠি।
এখুনি সেনাবাহিনীর মত ঝাঁপিয়ে পড়বে বৃষ্টি, চলো উঠি।
তুমি ঘাসের উপর বুড়ো বটগাছ বসে রইলে।
কলকাতা ডুবল, তুমিও ডুবলে
আমাকেও ডোবালে।
কেন আমার কথা শোনো না বল তো?
আমি কি নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি
যে সিংহাসনের হাতলে হাত রাখলেই হারিয়ে যাবে স্মৃতিহীন অন্ধকারে?
কলের জলের মতো
ক্যালেন্ডারের তারিখের মতো
বন্যার গায়ে খরার মতো
আমি তো তোমার সঙ্গেই আছি। এবং থাকবো।
তাহলে কেন আমার কথা শোনো না শুভঙ্কর?

বারবারা বিডলারকে 

– আসাদ চৌধুরী



বারবারা
ভিয়েতনামের উপর তোমার অনুভূতির তরজমা আমি পড়েছি-
তোমার হৃদয়ের সুবাতাস
আমার গিলে-করা পাঞ্জাবিকে মিছিলে নামিয়েছিল
প্রাচ্যের নির্যাতিত মানুষগুলোর জন্যে অসীম দরদ ছিল সে লেখায়
আমি তোমার ওই একটি লেখাই পড়েছি
আশীর্বাদ করেছিলাম, তোমার সোনার দোয়াত কলম হোক।
আমার বড়ো জানতে ইচ্ছে করে বারবারা, তুমি এখন কেমন আছ ?
নিশ্চয়ই তুমি ডেট করতে শিখে গেছ।
গাউনের রঙ আর হ্যাট নিয়ে কি চায়ের টেবিলে মার সঙ্গে ঝগড়া হয় ?
অনভ্যস্ত ব্রেসিয়ারের নিচে তোমার হৃদয়কে কি চিরদিন ঢেকে দিলে।
আমার ভীষণ জানতে ইচ্ছে করে বারবারা।
তোমাদের কাগজে নিশ্চয়ই ইয়াহিয়া খাঁর ছবি ছাপা হয়-
বিবেকের বোতামগুলো খুলে হৃদয় দিয়ে দেখো
ওটা একটা জল্লাদের ছবি
পনেরো লক্ষ নিরস্ত্র লোককে ঠাণ্ডা মাথায় সে হ্ত্যা করেছে
মানুষের কষ্টার্জিত সভ্যতাকে সে গলা টিপে হত্যা করেছে
অদ্ভুত জাদুকরকে দেখ
বিংশ শতাব্দীকে সে কৌশলে টেনে হিঁচড়ে মধ্যযুগে নিয়ে যায়।
দেশলাইয়ের বাক্সর মতো সহজে ভাঙে
গ্রন্থাগার, উপাসনালয়, ছাত্রাবাস,
মানুষের সাধ্যমত ঘরবাড়ি
সাত কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের ফুলকে সে বুট জুতোয়
থেতলে দেয়।


টু উইমেন ছবিটা দেখেছ বারবারা ?
গির্জার ধর্ষিতা সোফিয়া লোরেনকে দেখে নিশ্চয়ই কেঁদেছিলে
আমি কাঁদিনি, বুকটা শুধু খাঁ খাঁ করেছিল-
সোফিয়া লোরেনকে পাঠিয়ে দিয়ো বাংলাদেশে
তিরিশ হাজার রমণীর নির্মম অভিজ্ঞতা শুনে
তিনি শিউরে উঠবেন।
অভিধান থেকে নয়
আশি লক্ষ শরণার্থীর কাছে জেনে নাও, নির্বাসনের অর্থ কী ?
জর্জ ওয়াশিংটনের ছবিওলা ডাকটিকেটে খোঁজ থাকবে না স্বাধীনতার
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কাছে এসো-
সাধু অ্যাবের মর্মর মূর্তিকে গণতন্ত্র আর মানবতার জন্য
মালির ঘামে ভেজা ফুলের তোড়া দিয়ো না-
নিহত লোকটি লজ্জায় ঘৃণায় আবার আত্মহত্যা করবে।
বারবারা এসো,
রবিশঙ্করের সুরে সুরে মুমূর্ষু মানবতাকে গাই
বিবেকের জংধরা দরোজায় প্রবল করাঘাত করি
অন্যায়ের বিপুল হিমালয় দেখে এসে ক্রুদ্ধ হই, সংগঠিত হই
জল্লাদের শাণিত অস্ত্র
সভ্যতার নির্মল পুষ্পকে আহত করার পূর্বে,
দর্শন ও সাহিত্যকে হত্যা করার পূর্বে
এসো বারবারা বজ্র হয়ে বিদ্ধ করি তাকে।


কথোপকথন ৩৮

- পুর্ণেন্দু পত্রী

 - নন্দিনী! আমার খুব ভয় করে, বড় ভয় করে।
কোনও একদিন বুঝি জ্বর হবে, দরজা, দালান-ভাঙ্গা জ্বর
তুষারপাতের মত আগুনের ঢল নেমে এসে
নিঃশব্দে দখল করে নেবে এই শরীরের অলিগলি শহর বন্দর।
বালিশের ওয়াড়ের ঘেরাটোপ ছিঁড়ে ফেলে তুলো।
এখন হয়েছে মেঘ, উড়ো হাঁস, সাদা কবুতর।
সেইভাবে জ্বর এসে আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে কোন অন্য ভূমন্ডলে
নন্দিনী! আমার খুব ভয় করে, বড় ভয় করে।
- বাজে কথা বকে বকে কি যে সুখ পাও, শুভঙ্কর।
সত্যি বুঝি না।
কার জন্যে ছুরি নিয়ে খেলায় মেতেছো?
তুমি কি আমার মুখে রক্তদৃশ্য এঁকে দিতে চাও?
- ছুরি কই? ছুরি ছুঁড়ে দিয়েছি জঙ্গলে
খাঁ খাঁ দুপুরের মত লম্বা ছুরি ছিল বটে কিছুদিন আগে।
তখন যে প্রতিদ্বন্দী ছিল
তখন যে যুদ্ধ-দাঙ্গা-লুটপাট-ডাকাতির সম্ভাবনা ছিল
এখন ভীষণ এক ভয় ছাড়া অন্য কোনো প্রতিপক্ষ নেই।
যুদ্ধ নেই, কামানের তোপ নেই, অসুখ-বিসুখ কিছু নেই
ভয় ছাড়া অন্য কোনো বীজাণুর মারাত্মক আক্রমণ নেই।
-আমার যা কিছু ছিল সবই তো দিয়েছি, শুভঙ্কর!
তোমার বাঘের থাবা তাও ভরে দিয়েছি খাবারে।
চাঁদের মত ঘন বৃক্ষ ছায়া টাঙ্গিয়ে দিয়েছি
মাথার উপরে, ঠিক আকাশের মাপে মাপে বুনে।
তবুও, তোমার এত ভয়?
তবুও কিসের এত ভয়?
 - সেই ছেলেবেলা থেকে যা ছুঁয়েছি সব ভেঙ্গে গেছে।
প্রকান্ড ইস্কুলবাড়ি কাচের চিমনীর মত ঝড়ে ভেঙ্গে গেল।
একান্নবর্তীর দীর্ঘ দালান-বারান্দা ছেঁড়া কাগজের কুচি হয়ে গেল।
কচি হাতে রুয়ে রুয়ে সাজিয়েছিলাম এক উৎফুল্ল বাগান
কুরে কুরে খেয়ে গেছে লাল পিঁপড়ে, পোকা ও মাকড়।
একটা পতাকা ছিল, আকাশের অদ্বিতীয় সূর্যের মতন
তর্কে ও বিতর্কে তাও সাতটা আটটা টুকরো হয়ে গেল।
গাঁয়ের নদীকে ছুঁয়ে কী ভুল করেছি
নদীর ব্রীজকে ছুঁয়ে কী ভুল করেছি
কাগজ ও মুদ্রাযন্ত্র ছুঁয়ে আমি কী ভুল করেছি।
নন্দিনী!
তোমাকে যদি বাগান, পতাকা, ব্রীজ, কাগজের মতন হারাই?

Monday, 8 December 2014

উল্লেখযোগ্য স্মৃতি 

- নির্মলেন্দু গুণ 


আমার ভালোবাসা কিংবা প্রেম-সংক্রান্ত 
কোনো স্মৃতি নেই, যাকে ঠিক ভালোবাসা 
কিংবা প্রেম বলা যায়। 

একদিন টুকুদি নাকের ডগার বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখে 
বলেছিল ঃ তোর বউ তোকে খুব ভালবাসবে দেখিস। 
সে-ই আমার প্রেম, সেই আমার সর্বপ্রথম কল্পনায় 
রমনীয় ভালোবাসা পাওয়া, হঠাৎ যৌবন-ছোঁয়া 
কিশোর প্রথম প্রণয়। আর কোনো স্মৃতি নেই। 

একদিন নখ কাটতে কাটতে আঙুল কেটে গেলে 
প্রেমের শিশির হয়ে রক্ত ঝরেছিল, 
ডেটলে রক্তাক্ত ক্ষত ধুয়ে মুছে দিয়ে পূরবী বলেছিল, 
আমি তার চিরকালের শএু। 
আমি আজও শএু-মিএ তফাৎ বুঝি না। 
নিজের শএু হয়ে আমি আজ ও অপেক্ষমাণ, 
ঘুরেফিরে স্মৃতির সমুখে এসে এখনো দাঁড়াই। 

আমার এ ছাড়া ভালোবাসা কিংবা প্রেমের কাছাকাছি 
আর কোনো স্মৃতি নেই, সে-ই আমার প্রেম, 
অদ্যবধি সেই আমার পুণ্য ভালবাসা! 

আমার একাকী যাএা, জীবনের নিঃসঙ্গতা বুঝে 
সদ্যবিবাহিতা আমারই সহোদরা 
সিঁথিতে রঙিন চাঁদ মেখে একদিন 
শিয়রের কাছে বসেছিল ঃ চল কঁদিন আমার বাড়ি, 
সমুদ্রের হাওয়ায় কাটাবি। 

আমি জানি আজো সেই সমুদ্র্রের হাওয়া, 
আজো সেই একমাএ ভালবাসা স্মৃতি, 
আজো সেই মুহূর্তের প্রেম। 

আমার ভালোবাসা কিংবা প্রেম-সংক্রান্ত 
আর কোনো স্মৃতি নেই।


প্রিয় কবিতারা...