Showing posts with label ভ্লাদিমির মায়াকোভিস্ক. Show all posts
Showing posts with label ভ্লাদিমির মায়াকোভিস্ক. Show all posts

Friday, 18 April 2014

রুশ বিপ্লবী কবি ভ্লাদিমির মায়াকোভিস্কর সঙ্গে লিলিয়া ব্রিকের ছিল দীর্ঘদিনের প্রণয়। ভ. ভ. কাতাইয়ান সম্পাদিত মায়াকোভিস্ক সম্পর্কে সমসাময়িক নারীরা বইতে আটজন নারী স্মৃতিচারণা করেছেন। সেখানে লিলিয়া ব্রিকেরও একটি দীর্ঘ লেখা আছে। তারই একটি অংশ ছাপা হলো মায়াকোভিস্কর মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে, যেখানে ফুটে উঠেছে আত্মহত্যাপ্রবণ কবির অবয়ব।
রুশ থেকে অনুবাদ
ভ্লাদিমির মায়াকোভিস্ক [১৯ জুলাই ১৮৯৩—১৪ এপ্রিল ১৯৩০], প্রতিকৃতি: মাসুক হেলালভালোদিয়া কেন গুলি চালাল নিজের শরীরে?
জীবনকে মায়াকোভিস্ক ভালোবাসত দারুণভাবে। ভালোবাসত বিপ্লব, শিল্প, কাজ। ভালোবাসত আমাকে, মেয়েদের। ভালোবাসত বিলাসিতা। ভালোবাসত খোলা হাওয়া, যার মধ্যে ও নিঃশ্বাস নিতে পারত। দারুণ জীবনীশক্তি ছিল ওর। এই জীবনীশক্তি দিয়েই ও জয় করতে পারত জীবনের সব প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু ও জানত, সবকিছু জয় করা সম্ভব, শুধু সম্ভব নয় বার্ধক্যকে জয় করা। যুবক বয়স থেকেই এই ব্যাপারটিকে যমের মতো ভয় করত মায়াকোভিস্ক।
আত্মহত্যা নিয়ে যে কতবার মায়াকোভিস্ক কথা বলেছে! উফ! জানের ওপর দিয়ে গেছে সে কথাগুলো। ১৯১৬ সালের এক সকালে ঘুম ভাঙল টেলিফোনের শব্দে। নির্জীব, শান্ত কণ্ঠ মায়াকোভিস্কর, ‘আমি পিস্তলের গুলি দিয়ে আত্মহত্যা করছি। বিদায়, লিলিক।’ আমি চিৎকার করে বললাম, ‘একটু অপেক্ষা করো। আমার জন্য একটু অপেক্ষা করো।’ এরপর শোবার পোশাকের ওপর কিছু একটা চড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে উড়তে উড়তে নেমে একটি ঘোড়ার গাড়ি ঠিক করলাম। আমার মাথা তখন কাজ করছে না। ঘোড়ার গাড়ির চালককে ঘুষি মেরে বলছিলাম, ‘আরও জোরে, আরও জোরে...’। ওর বাড়িতে পৌঁছানোর পর মায়াকোভিস্ক দরজা খুলে দিল। দেখলাম, টেবিলের ওপর পিস্তল। বলল, ‘ট্রিগার টিপেছিলাম, কিন্তু ওই প্রকোষ্ঠে গুলি ছিল না। দ্বিতীয়বার চেষ্টা করিনি, তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি।’ আমি তখন ভয়ে আধমরা হয়ে গিয়েছিলাম, কোনোভাবেই নিজের মধ্যে ফিরতে পারছিলাম না। আমরা দুজন আমাদের ঝুকোভ্স্কায়ার বাড়িতে একসঙ্গে ফিরছিলাম। ওর মধ্যেই কবিতার খেলা খেলতে ও আমাকে বাধ্য করছিল। আমরা পাগলের মতো খেলছিলাম। একের পর এক কবিতা আবৃত্তি করে যাচ্ছিল মায়াকোভিস্ক—
এই আঁধারে অদৃশ্য গাছের কাছে
কে একজন
ঝরা পাতার শব্দ করছে
আর চিৎকার করে বলছে, প্রিয় আমার, তোমার জন্যই যা কিছু করেছি
তৈরি করেছি তোমার পছন্দের সবকিছুই।
(আন্না আখমাতোভার কবিতা)
আরও অনেক অনেক কবিতা, অন্যদের কবিতা... শেষ নেই যার....
১৯৫৬ সালে যখন রোমান ইয়াকোব্সন মস্কো এসেছিলেন, তখন তিনি আমাকে ১৯২০ সালে আমার বলা কিছু কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। আমরা সেদিন আখোৎনি রিয়াদ দিয়ে হেঁটে চলেছিলাম। রোমান বলছিলেন, ‘আমি ভাবতেই পারি না ভালোদিয়া (ভালোদিয়া: ভ্লাদিমির নামকে রাশিয়ায় আদর করে ভালোদিয়া ডাকা হয়) কোনো দিন বুড়ো হবে, ভাঁজ পড়বে ওর চামড়ায়।’ আর আমি নাকি তাঁকে বলেছিলাম, ‘ও বুড়ো হবেই না। তার আগেই আত্মহত্যা করবে। আগেও ও আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু পিস্তলের ওই প্রকোষ্ঠে গুলি ছিল না বলে বেঁচে গেছে। কিন্তু প্রত্যেকবারই নিশ্চয় বেঁচে যাওয়া সম্ভব নয়।’
গুলি করার আগে মায়াকোভিস্ক ক্লিপ সরিয়ে ব্যারেলে একটিমাত্র বুলেট ভরেছিল। আমি ওকে জানতাম বলে বলছি, ও নিজেকে ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়েছিল। ভেবেছিল, ভাগ্যে যদি মৃত্যু না থাকে, তাহলে ট্রিগার টিপলেও বুলেট বের হবে না। আরও কিছুদিন বেঁচে থাকবে।
কতবার যে মায়াকোভিস্কর মুখ থেকে আমাকে শুনতে হয়েছে, ‘নিজেকে গুলি করে মারব, আত্মহত্যা করব। ৩৫ বছর মানেই তো বৃদ্ধ হয়ে গেলাম। ত্রিশ হওয়া পর্যন্ত বাঁচব। এরপর আর থাকব না।’ কতবার যে আমি ক্লান্তিহীনভাবে ওকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে, সে ব্যালেরিনা নয়। লিয়েভ তলেস্তায়, গ্যেটে অনেক বছর বাঁচলেও তাঁরা বৃদ্ধ ছিলেন না। ঠিক তেমনি, তলেস্তায় আর গ্যেটের মতোই ভালোদিয়া সব সময়ই থাকবে ভ্লাদিমির মায়াকোভিস্ক হিসেবেই। আমি কি বলিরেখা দেখে ওকে আর ভালোবাসব না? যখন ওর চোখের নিচে মাংসের বালিশ হবে আর কপালে দেখা দেবে বলিরেখা, তখন তো আমি ওকে আরও বেশি ভালোবাসব। কিন্তু মায়াকোভিস্ক একগুঁয়ের মতো বলত, সে আমাকে বা নিজেকে বুড়ো বয়স পর্যন্ত দেখতে চায় না। আমি বলার চেষ্টা করতাম, ও যে শুভবুদ্ধিকে খুব ঘৃণা করে, সেই শুভবুদ্ধি হয়তো আসলেই খারাপ কিছু, কিন্তু শুভবুদ্ধি মানেই প্রৌঢ়ত্ব নয়। তলেস্তায় তো বুড়ো হননি।
কিন্তু ও চলে গেল। চলে গেল বোকার মতো, তরুণ বয়সেই।
আমার আর মায়াকোভিস্কর বয়স ৩০ ছোঁয়ার পর এ ধরনেরই এক আলোচনার মধ্যে (আমরা গেন্দ্রিকোভি পিরিউলোকের বাড়ির খাবার ঘরের চামড়ার ডিভানে বসেছিলাম) আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আমার যে ত্রিশ বছর হয়ে গেল, এবার কী হবে?’
সে বলল, ‘তুমি তো মেয়ে, তুমি ব্যতিক্রম।’
‘আর তুমি তাহলে ব্যতিক্রমী নও?’
মায়াকোভিস্ক এই প্রশ্নের উত্তর দেয়নি।
মায়াকোভিস্ক ছিল আত্মহত্যাপ্রবণ। সব ক্রনিকাল অসুখের মতোই মায়াকোভিস্কর এই অসুখটাও বেড়ে যেত প্রতিকূল পরিবেশে। এ কথা সত্যি, আত্মহত্যাবিষয়ক কথাবার্তা বা ভাবনাগুলোকে সব সময় একই রকমভাবে ভয় পেতাম, নাহলে তো বাঁচাই কঠিন হয়ে যেত। তাস খেলতে বসেছে, কেউ আসতে দেরি করেছে, ব্যস: কেউ তাকে সময় দেবে না। যখন অপেক্ষা করছে, পরিচিত মেয়েটা ওকে ফোন করছে না, ব্যস: কেউ ওকে কখনো ভালোবাসেনি। আর যদি এ রকম হয়েই থাকে, তাহলে এই জীবনের কোনো মানে নেই। এ ধরনের হিস্টিরিয়াগ্রস্ত অবস্থায় আমি হয় তাকে শান্ত করার চেষ্টা করেছি অথবা রাগ করেছি অথবা বলেছি, আমাকে আর কষ্ট দিয়ো না, ভয় পাইয়ে দিয়ো না।
কিন্তু কখনো কখনো আমি সত্যিই ভয় পেয়ে যেতাম, যখন বুঝতাম ও কোনো দুর্ঘটনা ঘটানোর অপেক্ষা করছে। মনে আছে, একবার গোসইজদাতের (গাসুদার্সেভন্নোয়ে ইজদাতেল্স্ভা—রাষ্ট্রীয় প্রকাশনালয়— অনুবাদক) দীর্ঘ সময় কারও জন্য অপেক্ষা করেছে, দাঁড়িয়েছে ক্যাশিয়ারের ঘরের সামনের সারিতে, যা প্রমাণ করার দরকার নেই তাই বাহুবলে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে, তারপর ঘরে ফিরে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়েছে বিছানায়, মাথা নিচের দিকে দিয়ে আক্ষরিক অর্থেই আর্তনাদ করেছে, ‘আমি আর পারি না। পা-রি-না।’ এ কথা শুনে আমি ভয়ে-আতঙ্কে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলাম। আমার কান্না দেখে সে নিজের কষ্ট ভুলে আমাকেই শান্ত করে তুলতে লাগল।...
...রোমান ইয়াকোব্সনের লেখা পড়ে জানলাম, ভালোদিয়া যখন জানতে পারল যে তাতিয়ানা (প্যারিসে বেড়াতে গিয়ে প্রেম হয়েছিল তাতিয়ানা ইয়াকভলেভার সঙ্গে, তিনি বিয়েও করতে চেয়েছিলেন মেয়েটিকে) আর ফিরে আসবে না রাশিয়ায়, তখন ওকে চিঠি লেখা বন্ধ করে দিয়েছিল। অবশ্য সত্যের খাতিরে বলতেই হয়, এ সময় ভালোদিয়া নোরা পোলান্স্কায়ার প্রেমে পড়েছিল।...যখন ও আত্মহত্যা করল, তখন আমি মস্কোতে ছিলাম না। যদি মস্কোতে থাকতাম, তাহলে হয়তো এই মৃত্যুকে ঠেকানো যেত। কে জানে!
ওর মৃত্যুর পর যে কটা দিন আমরা গেনদ্রিকোভ্কায় ছিলাম, আমি প্রতিদিনই শুনতে পেতাম কীভাবে ও ফিরে আসছে ঘরে, দরজা খুলছে চাবি দিয়ে, হাতের লাঠিটা রাখছে। এখনো দেখতে পাই কীভাবে ও কোট খুলে বুলকাকে (মায়াকোভিস্কর কুকুর) আদর করছে, তারপর তোয়ালে ছাড়াই ঢুকে যাচ্ছে বাথরুমে, ফিরছে নিজের ভেজা হাতদুটো অনেকটা সামনে এগিয়ে দিয়ে। প্রতি সকালে ও আমার পাশে বসত, টেবিল থাকত পেছনে, চা খেত, পত্রিকা পড়ত।
এখনো আমি মস্কো আর লেনিনগ্রাদের রাস্তায় ওকে হাঁটতে দেখি। কাছের মানুষদের ‘ভালোদিয়া’ নামে ডাকি।
মৃত্যুর আগে লেখা চিঠিটি ছিল ঠিকই কিন্তু তার পরও তো ওর মরে যাওয়ার কথা ছিল না। ভালোদিয়া চিঠিটা লিখেছিল ১২ তারিখে। নিজেকে নিজে গুলি করেছিল ১৪ তারিখে। যদি সে সময় অবস্থাটা ওর জন্য একটু সুখকর হতো, তাহলেই আত্মহত্যাটা ঠেকানো যেত। কিন্তু তখন সবকিছুই হয়েছে ভুল। সবকিছুই ছিল ভুলে ভরা। সে সময় বানিয়া (দি বাথ) চলল না, ‘রাপ’-এর (RaPP=রাসিস্কায়া আসোসিয়াৎসিয়া প্রলেতারেস্কাই পিসাতেলেই বা রাশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব প্রলেতারিয়ান রাইটার্স) লোকদের কাপুরুষতা ও ওর প্রতি সহমর্মিতার অভাব, প্রদর্শনীতে ও যাদের উপস্থিতি কামনা করেছিল, তাদের অনুপস্থিতি, আর ১৪ তারিখের আগের সারা রাত না ঘুমিয়ে থাকা, সবকিছুই ছিল ভুল। ও ঠিক কাজটা করেনি। এমনকি নোরা পোলান্স্কায়ার (মায়াকোভিস্কর শেষতম প্রেমিকা) সঙ্গেও ও ভুল আচরণ করেছিল। স্বামীর ঘর থেকে বের হয়ে আসার জন্য পোলান্স্কায়াকে জোর করছিল শুধু এটা প্রমাণ করতে যে ওর সামনে কেউ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। বানিয়া মঞ্চস্থ করাটাও ছিল ভুল। গণমাধ্যম প্রতিটি দিন নাটকটিকে খুব বাজে ভাষায় সমালোচনা করেছে, কিন্তু ওরা জানত না যে এই নাটকটি ছিল অসাধারণ। যে মানুষদের মায়াকোভিস্ক সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করত, বিশ্বাস করত নিজের চেয়েও বেশি, তারা বলেছিল, মায়াকোভিস্কর চোখ দশ বছর এগিয়ে রয়েছে। এখনো সবাই বুঝতে পারে না, আমলাতন্ত্র কত কী করতে পারে, বলতে পারে এই নাটকটি একেবারেই অসফল, বলতে পারে সামনেরটা হবে ভালো। চেখভের চাইকা-ও তো (সিগাল) শুরুতে সাফল্য পায়নি। হায়রে ‘রাপ’-এর লোকেরা! কিসের মূল্য কত, সেটা ও জানত! ওর কাছ থেকে আর কী আশা করেছিলে তোমরা? ও কোনো কাজেই উদ্যমহীন থাকতে পারত না।
...যে চিঠিটি রেখে গেছে, যেটায় বলা হয়েছে ‘সবাইকে’, সেটির তারিখ ছিল ১২ এপ্রিল।
‘আমি যে মারা যাচ্ছি, এ জন্য কাউকে দোষ দেবেন না, আর দয়া করে গসিপ করবেন না। এই মৃত লোকটি একেবারেই গসিপ পছন্দ করত না।
মা, বোনেরা এবং কমরেডরা, আমাকে ক্ষমা করবেন, এটা কোনো সত্যিকারের পথ নয় (অন্যদের এ পথে এগোতে পরামর্শ দেব না), কিন্তু এ ছাড়া আমার করার আর কিছুই ছিল না।
লিলিয়া—ভালোবেসো আমাকে।
কমরেড সরকার, আমার পরিবার হলো—লিলিয়া ব্রিক, মা, বোনেরা ও ভেরোনিকা ভিতোলেদাভ্না পোলান্স্কায়া।
তুমি যদি এদের জন্য একটি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন জীবন গড়ে দাও—তাহলে ধন্যবাদ।
শুরু করা কবিতাগুলো ব্রিকদের দিয়ে দাও, ওরা বুঝবে।
যেমন বলা হয়ে থাকে—
‘ঘটনার সমাপ্তি’
প্রেমের তরণি
ভেঙে পড়েছে জীবনে আঘাত হেনে
জীবনের হিসেব-নিকাশে
সমব্যথী কষ্টের দিকে কে আর নজর রাখে
ব্যথা
আর অপমান।
ভালো থাকুন আপনারা।’
—ভ্লাদিমির মায়াকোভিস্ক
১২/৬/৩০

(প্রথমআলো থেকে সংগৃহীত)
মায়াকোভিস্ক এর বইগুলো আপনি চাইলে সহজেই এমাজন থেকে কিনতে পারবেন।

প্রিয় কবিতারা...